বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে শিপিং খাত। এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে অনেকদিন ধরে কাজ করছে একাধিক ফোরাম। যেখানে দূষণের ওপর নির্ভর করে কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। সম্প্রতি এ ধরনের এক প্রস্তাবে শিপিং নিবন্ধনে ভূমিকা রাখে এমন দেশগুলোর বেশির ভাগই সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলছে, প্রতি টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে জাহাজ মালিকরা সমান হারে কর বা ফ্ল্যাট ট্র্যাক্স দেবে। খবর এফটি।
জাহাজ নিবন্ধনে বিশ্বের প্রধান দুটি কেন্দ্র হলো লাইবেরিয়া ও পানামা। দেশ দুটি ফ্ল্যাট ট্যাক্সে সমর্থন করেছে। তাদের সঙ্গে এ জোটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) ৪৩টি অঞ্চল। তারা ফ্ল্যাট ট্যাক্সে সম্মতি জানিয়েছে, জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে।
গত মাসে প্রস্তাবটি দেয়া হয়। এতে সমর্থন জানানো দেশগুলোয় নিবন্ধন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ১৬০ কোটি ডেডওয়েট টন, যা বৈশ্বিক ধারণক্ষমতার ৬৬ শতাংশ।
স্থলপথে বিকল্প জ্বালানি নিয়ে ব্যাপক কাজ হলেও সমুদ্রপথ এখনো প্রায় পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে শিপিং নিবন্ধন দিয়ে থাকে, এমন দেশগুলো কর প্রস্তাব সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে খাতটির বৃহৎ দুই শক্তি জাপান ও গ্রিস।
আইএমওর আলোচনায় থাকা এক প্রতিনিধি বলেন, ‘ফ্ল্যাট ট্যাক্স আরোপে লাইবেরিয়া ও পানামার সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি শিপিং নিবন্ধনে ভূমিকা রাখা বৃহত্তম দেশগুলো সমর্থন না জানায়, এটি যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কোনো প্রস্তাবের পক্ষে কিছু অংশের সমর্থন জানানো এবং হাউজ অব লর্ডসের বিরোধিতা করার মতো হতো। যেখানে একটি পক্ষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করে এবং আরেকটি পক্ষ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত করে।’
তিনি আরো উল্লেখ করেন, ভোটের ক্ষেত্রে এসব দেশের বড় কোনো প্রভাব নেই। তবে তারা আইএমওতে অর্থায়ন ও এর নির্বাহী পরিষদের পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে চীন, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শিপিং মালিকানায় বড় হিস্যাধারী ও রফতানিকারক দেশ ফ্ল্যাট ট্যাক্সের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
অবশ্য কর বিষয়ে এখনো অনেক কিছু চূড়ান্ত হয়নি, যেমন টনপ্রতি কার্বন নিঃসরণে জাহাজ মালিকরা কী পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করবেন। লাইবেরিয়া ১৮ ডলার ৭৫ সেন্ট ফি সমর্থন করলেও ১৫০ ডলারের পক্ষে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন কেন্দ্র মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ। অর্থাৎ লাইবেরিয়ার তুলনায় ১০ গুণ কর প্রস্তাব করেছে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ।
ইইউ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট ট্যাক্সের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে এ অর্থের ব্যবহার নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। দেশগুলো একমত নয় যে প্রাপ্ত অর্থ কোথায় ব্যয় হবে।
আইএমওতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরদাতাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ‘মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপের একটি অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে শিপিং থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাবদ কর বা অবদান থাকতে হবে।’
আরো বলা হয়েছে, এ ধরনের কর জ্বালানি রূপান্তরকে উদ্দীপিত করবে, জীবাশ্ম জ্বালানি এবং জিরো-নেয়ার-জিরো (জেডএনজেড) জ্বালানির মধ্যে মূল্য পার্থক্য কমাবে, পাশাপাশি জেডএনজেড জ্বালানি, প্রযুক্তি ও জ্বালানির উৎস গ্রহণ করতে সাহায্য করবে।
বার্ষিক হারে এ কর কার্বন ডাই-অক্সাইডের ‘জীবনচক্রের ভিত্তিতে’ নির্ধারণ করা হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, করের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ থেকে নিঃসরণ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখা জাহাজকে পুরস্কৃত করতে ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে এ প্রণোদনা পাবে গ্রিন মিথানল ও অ্যামোনিয়ার মতো লো-এমিশন ফুয়েল ব্যবহারকারীরা। এছাড়া করের কারণে দরিদ্র দেশগুলোয় যে আর্থিক চাপ পড়তে পারে, তা মোকাবেলায় এ অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে রূপান্তরে এ তহবিল তাদের সাহায্য করতে পারে।
লাইবেরিয়া এবং পানামা নিবন্ধন ফি ও কর কম রাখার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে গন্তব্য হিসেবে আকর্ষণীয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জাহাজ মালিক এ দেশগুলোয় নিবন্ধন করেছেন, যা দেশ দুটিকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ পরিচালনার জন্য দায়িত্বশীল করে তোলে।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের এনার্জি ও শিপিং গবেষক ট্রিস্টান স্মিথ সতর্ক করেছেন, ১৮ ডলার ৭৫ সেন্ট ফি যথেষ্ট হবে না, এমনকি যদি এটি প্রতিটি টন নিঃসরণের ওপর চাপানো হয়। তিনি বলেন, ‘একমাত্র ১০০-১৫০ ডলার ফি ও শূন্য-নিঃসরণকারী জাহাজের জন্য আর্থিক পুরস্কার ছাড়া জ্বালানি রূপান্তর অর্জন করতে পারবেন না।’
প্রস্তাবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি বাণিজ্যিক স্কিম সুপারিশ করা হয়েছে। যেখানে বেশি দূষণকারী জাহাজ মালিকরা কম দূষণ করে, এমন জাহাজ থেকে ক্রেডিট কিনবে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ব্রাজিল সমর্থন করেছে।
২০২৩ সালে আইএমও সদস্য রাষ্ট্রগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে শিপিং খাতের নিট শূন্য নিঃসরণ লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠন করতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।